কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬ এ ১১:৫৩ AM
কন্টেন্ট: পাতা
ভূমিকা: বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জননিরাপত্তা বিভাগের অধীন দেশের সর্ববৃহৎ একটি বাহিনী। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুসারে এটি একটি শৃঙ্খলা বাহিনী। এ বাহিনীর বর্তমান সদস্য সদস্যার সংখ্যা প্রায় ৬১ লক্ষ যাদের অধিকাংশই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এবং প্লাটুনভূক্ত স্বেচ্ছাসেবী। দেশের প্রতিটি গ্রামে গ্রামে এর বিস্তৃতি। সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী দেশের প্রতিটি গ্রামে ১টি পুরুষ ও ১টি মহিলা প্লাটুন রয়েছে। প্রতিটি প্লাটুনের সদস্য-সদস্যা সংখ্যা ৩২জন। এ বাহিনীর রয়েছে প্রায় ১৭ হাজার নিয়মিত ফোর্স যারা ৪২টি আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্য। এ বাহিনীতে রয়েছে ২ লক্ষাধিক সাধারণ আনসার যাদের ৭০ হাজার বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এবং স্মার্টকার্ডধারী অঙ্গীভূত আনসার এবং অবিশিষ্ট যারা তারা উপজেলা কোম্পানী, প্লাটুন এবং ইউনিয়ন প্লাটুনের অন্তর্ভূক্ত স্বেচ্ছাসেবী। 'শান্তি, শৃঙ্খলা, উন্নয়ন, নিরপত্তায় সর্বত্র আমরা'- এ বাহিনীর মূলমন্ত্র। স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে মানব নিরাপত্তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষা এ সদস্য সদস্যাদের অন্যতম লক্ষ্য। নিয়মিত ফোর্স হিসেবে আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যগণ দেশের পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর সাথে এবং সমতলে সরকারের নির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নিরাপত্তায় এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে থাকে।
নামকরণ: 'আনসার' শব্দের অর্থ সাহায্যকারী বা স্বেচ্ছাসেবক। এটি আরবি শব্দ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিগণকে সাথে নিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর যে সকল মদিনাবাসী নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণকে আশ্রয়দিয়ে সাহায্য করেছিলেন তাঁদেরকে বলা হত 'আনসার'। এ নামের অনুকরণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হয়। নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল অভিবাসীর আগমনের কারণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছিল। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে সমাজের উদ্যোমী ও আগ্রহী নানান পেশা শ্রেনীর স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের নিয়ে এ বাহিনী গঠিত হয় এবং যার নামকরণ হয় মদিনার আনসার এর অনুকরণে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ইতিহাস:
এদেশে আনসার বাহিনী প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ভারত ভাগের তথা দেশভাগের বেদনাদায়ক প্রেক্ষাপট জড়িত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ এবং ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষ্যে তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন সীমানা কমিশন গঠন করেন। ব্রিটিশ আইনজীবি স্যার সিরিল রেডক্লিফকে এই কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়। এর কাজ ছিল প্রধানত বাংলা ও পাঞ্জাবকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা। রেডক্লিফের দায়িত্ব ছিল এই দুটি প্রদেশের মধ্যে বিভক্তি লাইন টেনে দেওয়া, যা ছিল অত্যন্ত জটিল কাজ।
রেডক্লিফের ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ভারত ও ১৪ আগষ্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার কয়েকদিন পর। এতে এই দুই প্রদেশের লাখ লাখ মানুষ জানতো না তারা কোন দেশের অধিবাসী। তারপরও তারা স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপন শুরু করে। পরবর্তীতে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে বসবাসের জন্য রেডক্লিফের আঁকা বিভক্তি লাইন (যেটি পরে রেডক্লিফ লাইন নামে পরিচিতি পায়) তা অতিক্রম করতে হয়। এরই মধ্যে শুরু হয় ধর্মীয় সহিংসতা, আর তাতে প্রাণ হারায় প্রায় ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে ইংল্যান্ডে 'হোম গার্ড' নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গঠিত হয় যার আদলে ব্রিটিশ শাসিত ভারতেও হোম গার্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ ভাগের বেদনাদায়ক পরিস্থিতির কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্ভোগ সামাল দিতে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে এরকম একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন দেখা দেয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন এর আহবানে জেমস বুকানন নামের একজন বৃটিশ নাগরিক শরীরচর্চা বিভাগের পরিচালক হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং দ্রুততার সাথে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। খাজা নাজিম উদ্দিন তার মন্ত্রীবর্গ এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ সম্প্রসারিত মিটিং ডাকেন। সবাই মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে একমত হন যেএকটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন অত্যাবশ্যক। সেটা পূর্বে হোম গার্ডের ন্যায় সরাসরি সরকারের আদেশে না হয়ে সংসদীয় আইনের মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে বুকানন সাহেব সুপারিশ করেন।
তাঁর এই সুপারিশ অনুসারে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে আনসার বিল উত্থাপন করা হয়। সংসদে এই নাম নিয়ে তুমুল বিরোধিতা সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়ে যায়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের কেন্দ্রিয় সংসদও তা পাশ করে ফলশ্রুতিতে ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের আনসার অ্যাক্ট তথা আনসার রুল প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এই তারিখটিই আনসার প্রতিষ্ঠানের জন্মদিন হিসাবে পরিগণিত হয়ে আসছে। এই আইনের বলে বুকানন সাহেবকেই সর্বপ্রথম পরিচালক হিসাবে নিয়োগ করে মুখ্যমন্ত্রী নাজিম উদ্দিন। ১২ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে বর্তমান শাহবাগ এলাকায় অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর ভবনে হোম গার্ডের ২৭ জন কর্মকর্তার যোগদানের মাধ্যমে এই বাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয়। এর প্রায় তিন দশক পরে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আনসার ব্যাটালিয়ন। একই সালে প্রতিষ্ঠিত হয় গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (ভিডিপি)।
আমাদের গর্ব: ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আনসার বাহিনী উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। যা নিচে বর্ণনা করা হলো।
ক। মহান ভাষা আন্দোলন: জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীনতা, নিজস্ব পতাকা, প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশ। এর বীজ প্রোথিত হয়েছিল ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে। সে আন্দোলনে অন্যদের সঙ্গে শহীদ হয়েছেন ময়মনসিংহের আনসার প্লাটুন কমান্ডার আবদুল জব্বার। যার আত্মত্যাগ ও অবদানে এ বাহিনী গর্বিত।
খ। ১৯৫৪ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালন: ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ৭০,০০০ আনসার সদস্য এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ১,২০,০০০ আনসার সদস্য নির্বাচন কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করে।
গ। পাক ভারত যুদ্ধে আনসার ভিডিপি সদস্যদের বিওপিতে দায়িত্বপালন: ১৯৬৫ সালে ঐতিহাসিক পাক ভারত যুদ্ধের সময় দেশের সীমান্ত ফাড়িগুলোতে তৎকালীন ইপিআর এর সাথে আনসার বাহিনীকে বিওপি প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়।
ঘ। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আনসার বাহিনীর ভূমিকাঃ
আনসার সদস্যদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং আনসার বাহিনী চল্লিশ হাজার ৩০৩ রাইফেল প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রথম হাতিয়ার। ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষনার পর পরই আনসার বাহিনীর বিভিন্ন পদবীর কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ অসংখ্য আনসার সদস্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালে সারাদেশে আনসার বাহিনীর প্রশিক্ষণ চলছিল। এসব প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ব্যবহার হচ্ছিল আনসারদের সব রাইফেল। প্রশিক্ষণ শেষে রাইফেল পুলিশ কোতে জমা দেয়ার কথা থাকলেও কোন কোন স্থানে অল্প বা কোথাও কোনো রাইফেলই জমা দেয়া হয়নি। বরং ২৫ মার্চের আক্রমণের পরই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে আনসারদের ৪০,০০০ রাইফেল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আনসার ও অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ অস্ত্র দিয়েই মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ পর্ব শুরু হয়।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে আগ্রহী যুবকদের প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আনসার বাহিনীর সদস্যরা : স্বাধীণতা যুদ্ধের শুরুতেই অসংখ্য আনসার এতে যোগ দেয়। দেশের সর্বত্র তারা অংশগ্রহণ করে প্রতিরোধ যুদ্ধে। কিন্তু প্রতিরোধ যুদ্ধে টিকতে না পেরে স্বাধীনতাকামী অনেক আনসার কমান্ডার ও আনসার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। তাঁরা সঙ্গে নিয়ে যান রাইফেল, গুলি ও এলাকার আগ্রহী যুবকদের। সেখানে তারা যোগ দেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবিরে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার দায়িত্ব নেন অসংখ্য আনসার কমান্ডার।
বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের প্রধানকে "Guard of Honor" প্রদান করেন আনসার বাহিনীর সদস্যরা : ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। এই সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানকে প্লাটুন কমান্ডার ইয়াদ আলীর নেতৃত্বে ১২ জন আনসার সদস্য "গার্ড অব অনার" প্রদান করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এটি এক অনন্য সাধারণ ঘটনা।
মুক্তিযুদ্ধে আনসার সদস্যদের আত্মত্যাগ।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে আনসার বাহিনীর ৯ কর্মকর্তা, ৪ কর্মচারীসহ মোট ৬৭০ জন আনসার সদস্য শাহাদতবরণ করেন।
৯। বীরত্বপূর্ণ খেতাবঃ স্বাধীনতা যুদ্ধে দুঃসাহসিক অবদানের জন্য যুদ্ধ পরবর্তী সরকার ০১ জন আনসার সদস্যকে বীর বিক্রম ও ০২ জন আনসার সদস্যকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করেন।